মুক্তিযুদ্ধ ও দেশপ্রেম সম্পর্কে ইসলাম কি বলে আলোচনা করুন?

মুক্তিযুদ্ধ ও দেশপ্রেম সম্পর্কে ইসলাম কি বলে আলোচনা করুন?

21 বার প্রদর্শিত
"বাংলাদেশের ইতিহাস" বিভাগে জিজ্ঞাসা করেছেন (4,617 পয়েন্ট)
Like

1 উত্তর

মুক্তিযুদ্ধ ও দেশপ্রেম : হুববুল ওয়াতানি মিনাল ঈমান অর্থাৎ দেশপ্রেম ঈমানের অংশ। মানষ তার ভূমিষ্ঠ স্থান এবং তার লালনপালনের স্থানটিকে সহজাতভাবেই ভালােবাসে। জন্মভূমিকে আলােবাসা সকল মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। নিজ জন্মভূমির প্রতি, শৈশবের লীলাভূমির প্রতি যে ভালােবাসা বর নামই দেশপ্রেম। দেশের স্বার্থের সঙ্গে দেশের প্রতিটি নাগরিকের স্বার্থ ওতপ্রাতভাবে জড়িত।

দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে যুগে যুগে মানুষ নিজেদের বিলিয়ে দিয়েছেন। দেশেরসম্মান ও স্বাধীনতা বজায় রাখার জন্য, স্বজাতির জন্য প্রাণ বিসজন দেওয়াকে প্রকৃত মানবতার সেবায় আত্মােৎসর্গ বলে মনে করেন প্রকৃত দেশপ্রেমিক। স্বদেশের ল সেবায় তথা মানবতার সেবায় আত্মোৎসর্গ করতে পারলে সত্যিকার দেশপ্রেমিক নিজেকে ধন্য মনে করেন।

এর বিপরীত ধারার মানুষও আছে যারা দেশদ্রোহী,মানবতার শত্ৰু এবং ইতিহাসে তাদেরকে সেভাবেই মূল্যায়ন করা হয়। স্বদেশপ্রীতির প্রবৃত্তি স্বাভাবিক ও চিরন্তন। তবে স্বদেশের সেবা করার জন্য যে কেবল যুদ্ধই একমাত্র পথ তা নয় যেখানে দেশের স্বাধীনতা বিপন্ন, যেখানে পর্যুদস্ত মানবতা এমন অবস্থায় দেশ তথা দেশবাসীকে রক্ষা করার জন্য যথাসাধ্য যুদ্ধ করা অবশ্য প্রয়ােজনএছাড়াও দেশের জন্য কল্যাণকর ও মঙ্গলজনক কার্যকলাপের মাধ্যমেও দেশপ্রেম উদ্ভাসিত হয়।

১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশের জনগণের সার্বিক অংশগ্রহণ দেশপ্রেমের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। সে সময় জনগণ অস্তিত্ব রক্ষা ও মর্যাদার লড়াইয়ে একটি অসম যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। সম্মুখ- সমরে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন বহু মুক্তিযােদ্ধা আর বহু মানুষ পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের দোসরদের দ্বারা অত্যাচারিত ও নির্যাতিত হয়েমৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন। অধিকার বঞ্চিত হতভাগ্য মানুষদের সাহায্যের জন্য সে সময় খুবই সীমিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব ছিল। তারা তাদের জীবন অকাতরে দান করেছেন এই মাটির জন্য।আভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত দুশমনের বিরুদ্ধে জাগ্রত থেকে আত্মসচেতনতা ও আত্মমর্যাদাবােধ সম্পন্ন মানুষ স্বদেশ, স্বজাতি ও স্বসংস্কৃতি রক্ষার জন্য প্রাণপণ সচেষ্ট ছিল স্বাধীনতার সিংহপুরুষদের আত্মত্যাগ আমাদের হৃদয়কে আলােকিত করে, ব্যথিত করে ও গর্বিত করে অত্যাচারিত জাতির প্রতি অঙ্গীকার ও দায়বদ্ধতা পালন করতে গিয়ে তাঁরা জীবন উৎসর্গ করেছেন জাতির জন্য। 

যেসব শহীদ নতুন প্রজন্মের কাছে রেখে গিয়েছেন বিজয়ের বার্তা, যারা তাঁদের দেখেননি বা তাঁদের সম্বন্ধে সঠিক কোনাে তথ্য নতুন প্রজন্মের জানা নেই। আগামীতে বাংলার মাটির লক্ষ কোটি সন্তানের কাছে তাঁরা বেঁচে রইলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানাে এবং ন্যায়ের পক্ষে লড়াইয়ের বীর সেনানী হিসেবে। তাঁদের কাহিনী সম্বন্ধে এদেশের মানুষ এবং নতুন প্রজন্ম এখনাে অনেকাংশে অজ্ঞ।

আমরা যতই আত্মবিস্মৃত হই না কেন আমাদের জাতির ইতিহাসে এসব মানুষের আত্মত্যাগের রেখাপাত থাকতেই হবে। তাঁদের আত্মত্যাগের তথ্য আবারাে আলােয় আনতে হবে। তাঁদের উজ্জ্বল ও বেগবান জীবনের ইতি ঘটেছে অকালে কিন্তু তাঁদের সম্মানের সঙ্গে স্মরণ রাখতে হবে। তাঁদের আত্মত্যাগ আমাদের জাতির আত্মপরিচয় ও মৌলিক উপাদান। তাঁদের আদর্শ অনুকরণ করে আবহমান যুগ ধরে
এদেশের মানুষ অত্যাচার ও অবিচারের বিরুদ্ধে সােচ্চার হবে, সত্য ও ন্যায়ের পথ ধরে আদর্শ জাতি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করবে। স্বাধীনতা আমাদের শ্রেষ্ঠ অর্জন। বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে এটাই শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। শত শত বছরের শােষণ-শাসন, লাঞ্ছনা-গঞ্জনার শিকার বাঙালিরা ১৯৭১ সালে ভিজে মাটির সোঁদা গন্ধ হৃদয়ে ধারণ করে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন স্বাধীনতার রক্ত লাল সর্য ছিনিয়ে আনতে। সে ইতিহাস শুধু বিজয়ের আর গর্বের নয়, বেদনারও। স্বাধীনতার লাল সূর্যটা ছিনিয়ে আনতে সেদিন দেশপ্রেমিক প্রতিটি মুক্তিপাগল মানুষ জীবন বাজি রেখে হাতে তুলে নিয়েছিলেন অস্ত্র। 

ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর ওপর। সম্মুখসমরে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন বহু মুক্তিযােদ্ধা আর বহু মানুষ পাকিস্তান সেনাবাহিনী ওতাদের দোসরদের দ্বারা অত্যাচারিত ও নির্যাতিত হয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন।

১৯৭১-এ বর্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা গণহত্যা কিংবা নারীর সম্ভ্ম হরণ, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযােগের মতাে জঘন্য ঘটনা ঘটিয়েছে। এই নারকীয় অবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছে এদেশের জনগণকে। স্বাধীনতার জন্য জনগণের এই আত্মত্যাগ আমরা কখনােই ভুলতে পারব না। অত্যাচারিত জাতির প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ জীবন উৎসর্গকারীরা নতুন প্রজন্মকে স্বাধীন বাংলাদেশ
উপহার দিয়েছেন। নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে লক্ষ লক্ষ মানুষ নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন। জানা অজানা বহু মানুষ হারিয়ে গেছেন আমাদের মাঝ থেকে। মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের দোসররা পরিকল্পনা করেছিল যে, গণহত্যা ও নির্যাতন শুরু করলে এদেশের মানুষ ভয় পেয়ে যাবে এবং এর মাধ্যমে স্বাধীনতার দাবি রুখে দেওয়া সম্ভব হবে। তাই তারা ২৫শে মার্চের কালাে রাতে আচমকা আক্রমণ পরিকল্পনা করেছিল। 

প্রথমে তারা বড়াে শহরগুলােতে এই আক্রমণ চালায়। কিন্তু অতি দ্রুত অত্যাচারের প্রক্রিয়া পুরাে দেশে ছড়িয়ে পড়ে সহানুভূতিশীলদের বার্তাবাংলাদেশের মানুষের নিকট পৌঁছতে থাকে। এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে তাঁদের বার্তা বাংলাদেশের নিপীড়িত মানুষকে উৎসাহ ও প্রেরণা যােগায় এবং সমগ্র জাতি এক্যের সেতুবন্ধনে আবদ্ধ হয়। সারা বিশ্বপাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের দোসরদেরকুকীর্তির তাব্র সমালোেচনা ও নিন্দা করতে থাকে এবং এর ফলে তারা আরও মরিয়া হয়ে বাংলাদেশের মানুষের ওপর অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ এই অত্যাচারের সংবাদে বিচলিত হয়ে পড়েন এবং তাদের দেশের প্রতিটি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে সংগ্রামী মনােভাব। পুরাতন ভাবধারার সহজ সরল মানুষ এবং নতুন ভাবধারার প্রজন্ম সবাই দেশ স্বাধীন করার জন্য সংগ্রামে যােগদান করতে থাকেন।

পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাদের অত্যাচারের মাত্রা যত বাড়াতে থাকে বাঙালির প্রতিরােধ সংগ্রাম ও ততই বাড়তে থাকে। এদেশের শান্তাপ্রিয় মানুষ আর নিষ্ক্রিয় না থেকে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়েন।

এর মাধ্যমেই সংগ্রাম আসন্ন হয়ে পড়ে। নয় মাস ধরে রক্ত ঝরেছে এদেশের মাটিতে। শত্রুবাহিনী প্রতিরােধের সম্মুখীন হয়েছে এবং তারা চালিয়েছে আরও বড় আকারের নিরধনযজ্ঞ। দেশপ্রেমের জন্য চবম মূল্য দিয়েছেন এদেশের সাধারণ মানুষ। দেশপ্রেমিক ও স্বাধীনতার স্বপ্ন বিভাের মানুষগুলাে আকাতরে জীবন দান করেছেন। তাদের রক্তে স্বাধীনতার অভিযেক হয়েছিল। তাঁরা বরণীয় ও স্মরণীয়। তাদের সকলের নাম আজও সঠিকভাবে ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ করা হয়নি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে এদেশের মানুষ তাদের প্রাণপ্রিয় ভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা কিমাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। বাঙালির এই সাফল্য পাকিস্তানী শাসকের কাছে ছিল পরাজয়, আর তাই তারা পরিকল্পিতভাবে এদেশের ভাষা, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির ওপরে ক্রমাগত আঘাত হানতে থাকে। সেসময় থেকেই এদেশের মানুষের মধ্যে জীবনধর্মী ও মানবতাবাদী চেতনার স্কুরণ ঘটে এবং ধীরে ধীরে এই চেতনাই বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলনের রূপ নেয়। ভাষা আন্দোলনের জাতীয় চেতনা হয়ে ওঠে তীক্ষ্ণ ও তীব্র। ভাষার অধিকার নিয়ে যে আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল তার লক্ষ্য ও গণ্ডি ধীরে ধীরে একটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সূচনা করে। বাঙালির হাজার বছরের সংগ্রাম গৌরবােজ্জ্বল ইতিহাসে বাংলার কৃষক ও সাধারণ মানুষ তিতুমীর
থেকে টিপু পাগলা পর্যন্ত অজস্র স্বাধীনতাকামী বীর নেতৃবৃন্দের সাথে থেকে সংগ্রাম করেছেন। এই দীর্ঘ সংগ্রামে তারা অত্যাচার, নির্যাতন, নিপীড়ন ও বৈষম্যের শিকার হয়েছেন যুগে যুগে ধারাবাহিকভাবে এদেশের মানুষ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দোসরদের বিরুদ্ধেও সংগ্রাম লিপ্ত হয়েছেন। বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক বিচক্ষণতা ও দৃপ্ত নেতৃত্বে এদেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাঁর নির্দেশে যার যা আছে তা নিয়েই শত্রুর মােকাবেলার জন্য প্রস্তুত হন এবং তাঁর নির্দেশক্রমে তারা চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যেতে থাকেন। এই দেশপ্রেমিকদের একতা ও দেশপ্রেমের সাক্ষ্য বহন করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম। এদেশের মানুষের সাহস, শৌর্য ও বীরত্বের কাছে বিদেশি সেনাবাহিনী ও তাদের দোসররা সম্পূর্ণভাবে পরাজিত হয়। বাঙালি জাতির ইতিহাস হলােসংগ্রামী চরিকত্রের ইতিহাস। এদেশের মানুষ যেমন দেশের মাটি, ফুল, ফল, পাখিভালােবাসেন, এসব নিয়ে কবিতা লেখেন, কাব্যচর্চা করেন ঠিক তেমনিই তারা সম্মুখসমরে ও এগিয়ে যেতে পারেন। সামরিক কুচকাওয়াজে তারা বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের 'চল চল চল সঙ্গীত ধারণ করে যুদ্ধক্ষেত্রে এগিয়ে চলেন। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর কবল থেকে এদেশের মানুষকে মুক্ত করতে যারা জীবন দান করেছেন, অত্যাচারে জর্জরিত হয়েছেন তারা একটি বিরাট আদর্শের প্রেরণায় নিজেদের সর্বস্ব বিসর্জন দিয়েেছিলেন। কিন্তু তাদের সেই অবদান বহুলাংশেই লোকচক্ষুর আড়ালে বিলীন হয়ে গেছে। বাঙালি জাতির চিন্তা, নিদ্রা, স্বপ্নে তখন ছিল শুধুমাত্র স্বাধীনতা অর্জন। এই নবশক্তিতে বলীয়ান হয়ে মানুষ তাদের দেশপ্রেমের চূড়ান্ত নির্দর্শন রেখে গেছেন ১৯৭১ সালে । দেশপ্রেমিক মানুষগুলাে নির্ভীকচিত্তে মর্যাদা নিয়ে বাঁচার পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন। এই অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশপ্রেমিকরা চেয়েছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা। দেশপ্রেমের উদ্দীপনা হদয়ে ধারণ করে দেশপ্রেমিকেরা এগিয়ে গিয়েছেন, মত্যুকে উপেক্ষা করে এবং যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে দেশ স্বাধীন করেছেন।

উত্তর প্রদান করেছেন (4,617 পয়েন্ট)

সম্পর্কিত প্রশ্নগুচ্ছ

1 উত্তর
10 অক্টোবর 2021 "বিজ্ঞান" বিভাগে জিজ্ঞাসা করেছেন Sujit Ray (10,251 পয়েন্ট)
1 উত্তর
02 অক্টোবর 2021 "বাংলাদেশের ইতিহাস" বিভাগে জিজ্ঞাসা করেছেন অজ্ঞাতকুলশীল
1 উত্তর

17,573 টি প্রশ্ন

17,275 টি উত্তর

24 টি মন্তব্য

54,717 জন সদস্য

Answer Fair এ সুস্বাগতম, যেখানে আপনি প্রশ্ন করতে পারবেন এবং গোষ্ঠীর অন্যান্য সদস্যদের নিকট থেকে উত্তর পেতে পারবেন।
20 Online Users
0 Member 20 Guest
Today Visits : 10627
Yesterday Visits : 25779
Total Visits : 5850014
...