মহাবিশ্ব কি সম্প্রসারণশীল?

মহাবিশ্ব কি সম্প্রসারণশীল?

58 বার প্রদর্শিত
"বিজ্ঞান" বিভাগে জিজ্ঞাসা করেছেন (365 পয়েন্ট)
Like

1 উত্তর

ধারণা হল যে হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের মনে অসীম স্থির বিশ্বের যে ধারণার সৃষ্টি হয়েছিল বিগত একশ বছরের কম সময়ের মধ্যে সে ধারণা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। হাব-এর পর্যবেক্ষণ প্রমাণ করেছে যে মহাবিশ্ব সম্প্রসারণশীল। অপেক্ষবাদ আমাদের শিখিয়েছে যে মহাবিশ্ব চারমাত্রিক এবং সম্ভবত: সসীম। এছাড়া আমরা আরাে জেনেছি, এই বিশ্বজগষ্টা কত বিরাট এবং সেই বিরাটত্বে আমাদের এই ক্ষুদ্র পৃথিবীর স্থান কত নগণ্য।

 আমাদের এই মহাবিশ্ব দুটি জগতে বিভক্ত। বৃহত্তর জগৎ এবং ক্ষুদ্রের জগৎ। পূর্ববর্তী অধ্যায়ে আমরা বৃহত্তর জগৎ নিয়ে আলােচনা করেছি। এই অধ্যায়ে আমরা ক্ষুদ্রের জগৎ বিশেষ করে পদার্থের মৌল উপাদান নিয়ে আলােচনা করব । প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্রে উল্লেখ আছে, ব্রহ্মাণ্ডের যাবতীয় পদার্থ পাঁচটি উপাদানে তৈরি। ক্ষিতি (মাটি), অব (জল), তেজ (আগুন), মরুৎ (বায়ু) এবং ব্যোম (আকাশ)। প্রাচীন গ্রীক মনীষীদের মতে এই উপাদান চারটি।

 মাটি, জল, বায়ু ও আগুন। এখানে লক্ষণীয় যে গ্রীক দর্শনে শূন্যের (void) কোন স্থান নেই। সৃষ্টিতে ‘শূন্যের যে বিশেষ ভূমিকা থাকতে পারে একথা ভারতীয়রাই প্রথম অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। এমন কি অ্যারিস্টটলও তার ব্রহ্মাণ্ড পরিকল্পনায় শূন্যের উল্লেখ করেন নাই । তবে অ্যারিস্টটলের বহু আগে খ্রিঃ পূঃ পঞ্চম শতাব্দিকে গ্রীক দার্শনিক বিজ্ঞানী লিউসিপপাস এবং ডিমােক্রিটাস পদার্থের গঠন সম্পর্কে পরমাণু মতবাদ ব্যক্ত করেন।

অবশ্য অনেকের মতে গ্রীকদের বহু আগে ভারতীয় ঋষি কণাদ প্রথম পরমাণুবাদের কথা বলেছিলেন। ভারতীয় শাস্ত্রে কণাদ-এর পরমাণুবাদের উল্লেখ আছে। গ্রীক পরমাণুবাদের মূল কথা হল, এই ব্রহ্মাণ্ডের যাবতীয় পদার্থ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বস্তুকণা বা অণু দ্বারা গঠিত। পরমাণুরা অপরিবর্তনশীল এবং অনন্তকাল থেকে বিদ্যমান। এদের উৎপত্তিও নেই বিনাশও নেই। পরমাণুরা মহাশূন্যে লক্ষ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ায় এবং মাঝে মাঝে নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে জটিল গতি ও আবর্তের সৃষ্টি করে। এই আবর্তে সমগুণ সম্পন্ন পরমাণুরা মিলিত হয়ে মৌলিক পদার্থের সৃষ্টি করে। বিভিন্ন মৌলিক পদার্থের মিশ্রণে বস্তু নিচয় এবং ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি হয়। গ্রীক প্রকৃতিবাদী দার্শনিকদের একাংশ আবার সৃষ্টির অদ্বৈতবাদে বিশ্বাসী। এই অদ্বৈতবাদ মূলত: বস্তুবাদী অদ্বৈতবাদ।

 এই মতবাদে বলা হয়, মহাবিশ্ব একটি মাত্র আদিম বস্তু দিয়ে তৈরি। অর্থাৎ মহাবিশ্ব এক ও অবিভাজ্য। আয়ােনীয় গ্রীক বিজ্ঞানীদের মধ্যে এই মতবাদের প্রধান প্রবক্তা ছিলেন পার্মেনিডিস (খ্রিঃ পূঃ ৬ষ্ঠ শতাব্দি)। তিনি বলেন, বিশ্ব “কি তা বুঝতে হলে আগে চিন্তা করতে হবে বস্তু “কি' এবং বম্ভ ‘কি নয়'। বস্তু 'কি নয়’ একথা অর্থহীন। কেননা তা কিছুই নয় । যা কিছু নয়’ তার অস্তিত্ব থাকতে পারে না। সুতরাং বিশ্ব যা কিছু তা দিয়ে পরিপূর্ণ প্লেনাম (স্থান) যেখানে কোন খালি জায়গা নেই। পার্মেনিডিসের দর্শনে সৃষ্টি এবং বিনাশ অসম্ভব। কারণ কিছু না’ থেকে ‘কিছুর উম্ভব যুক্তির বিচারে অসম্ভব। আবার কিছু কিছু না'তে পর্যবসিত হতে পারে না। একই কারণে কিছুর পরিবর্তনও অসম্ভব।

 কিন্তু আমরা দেখতে পাই, মহাবিশ্বের বিভিন্ন অঙ্গ রয়েছে যাদের প্রকৃতি ভিন্ন এবং সেখানে পরিবর্তন আছে। এ প্রসঙ্গে পার্মেনিডিস বলেন, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ব্রহ্মান্ড সত্য নয়। ইন্দ্রিয় আমাদের প্রতারিত করতে পারে। সুতরাং ব্রহ্মান্ডে যে সব পরিবর্তন আমরা দেখি বা মনে করি দেখি তা আমাদের চেতনার বিভ্রম মাত্র। তাঁর মতে ব্রহ্মান্ডকে বুঝতে হলে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য পর্যবেক্ষণ বাদ দিয়ে অবচেতন মনে শুদ্ধ চিন্তার সাহায্যেই বুঝতে হবে। বস্তুনিচয় সম্পর্কে পার্মেনিডিসের এই অদ্বৈতবাদী ব্যাখ্যা প্রাচীন গ্রীক বিজ্ঞানীদের অনেকে সমর্থন করলেও ইন্দ্রিয় যে আমাদের সম্পূর্ণরূপে প্রতারিত করে একথা অনেকেই মেনে নিতে পারেন নি।

ফলে একটি মাত্র মৌলিক বস্তু দ্বারা ব্রহ্মাণ্ড গঠিত এই ধারণার পরিবর্তে অল্পসংখ্যক কয়েকটি মৌলিক বস্তু দ্বারা ব্রহ্মান্ড গঠনের একটি ধারণা জন্মলাভ করে। লিউসিপপাস (খ্রিঃ পূঃ ৫ম শতাব্দি) ছিলেন এই সীমিত অদ্বৈতবাদের অন্যতম প্রবক্তা। তিনি বলেন, প্লেনাম একটি একক অস্তিত্ব নয়, বরং অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্লেনামের সমষ্টি। সুতরাং সব কিছু হল বহু, বহুর প্রত্যেকে এক একটি প্লেনাম এবং সে কারণেই প্রত্যেকটি অবিভাজ্য। এই অবিভাজ্য বস্তুকণার নাম হল ‘এট। এটম মানে ‘অবিভাজ্য। তিনি বলেন, বস্তুনিচয় একটি সুশৃঙ্খল কার্যকরণ নিয়মের অধীনে এই সব 'এটম্'-এর সমন্বয়ে গঠিত। অর্থাৎ এই রূপ-রস-গন্ধময় প্রকৃতি মানুষের উচ্ছাস, অনুভূতি ও ভালবাসার সৃষ্টি নয়। বরং প্রাকৃতিক কার্যকারণ নিয়মে উদ্ভূত এবং মানুষের প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন ও নিরপেক্ষ । লিউসিপপাস ছিলেন কার্যকারণ নিয়ন্ত্রিত আণবিক মতবাদের প্রথম প্রবক্তা।

 পরবর্তীতে তার ছাত্র ডিমােক্রিটাস এই তত্ত্বকে আরাে বিস্তৃত এবং তাৎপর্যপূর্ণ করেন। তাঁর হাতে অবশ্য এই তত্ত্ব খানিকটা পরিবর্তিত হয়। তিনি মনে করতেন, “কিছু হল পরমাণু এবং শূন্যস্থানের সমাহার। অর্থাৎ মহাবিশ্বে পরমাণু এবং শূন্যতাই একমাত্র শাশ্বত সত্য।  পারমাণবিক তত্ত্বে শূন্যস্থানের ধারণার সুবিধা হল এই যে, এর দ্বারা বস্তুর সংকোচন এবং প্রসারণ ব্যাখ্যা করা যায় । গ্রীক আণবিক তত্ত্ব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। প্লেটো এবং অ্যারিস্টটলের সমালােচনার মুখে এই তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। অ্যারিস্টটল আণবিক মতবাদে বিশ্বাস করতেন না।

কেননা তাঁর মতে সকল বস্তুই যদি একই পরমাণু দ্বারা গঠিত হয় তাহলে সমান আয়তনের প্রত্যেক বস্তুর ওজনও সমান হবে। সেক্ষেত্রে ক্ষুদ্র আয়তনের জল বা মাটি বাতাসে ডুবতে পারে না। অ্যারিস্টটলের এই যুক্তি আপাতদৃষ্টিতে অকাট্য। কারণ তখন পর্যন্ত বস্তুর আপেক্ষিক গুরুত্ব সম্পর্কে কিছুই জানা ছিল না। আণবিক তত্ত্বের প্রধান ভিত্তি হল শূন্যস্থানের কল্পনা। কিন্তু অ্যারিস্টটলের মতে।
উত্তর প্রদান করেছেন (365 পয়েন্ট)
সম্পাদিত করেছেন
খু্বিই যুক্তিসংগত উত্তর।

সম্পর্কিত প্রশ্নগুচ্ছ

1 উত্তর
22 মে 2021 "বিজ্ঞান" বিভাগে জিজ্ঞাসা করেছেন Arman (365 পয়েন্ট)

17,573 টি প্রশ্ন

17,275 টি উত্তর

24 টি মন্তব্য

54,717 জন সদস্য

19 Online Users
0 Member 19 Guest
Today Visits : 25241
Yesterday Visits : 32054
Total Visits : 16060905
...