মহাবিশ্ব স্থির নাকি গতিশীল?

মহাবিশ্ব স্থির নাকি গতিশীল?

71 বার প্রদর্শিত
"বিজ্ঞান" বিভাগে জিজ্ঞাসা করেছেন (365 পয়েন্ট)
Like

1 উত্তর

মহাবিশ্ব স্থির না গতিশীল সে সম্পর্কে প্রথম পর্যবেক্ষণমূলক প্রমাণ মেলে ১৯২৯ সালে আমেরিকান জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডুইন হাবুল-এর দুটো গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার থেকে। হাব অবশ্য তার আগে থেকেই আকাশ পর্যবেক্ষণরত ছিলেন।নক্ষত্রদের বর্ণালীতে যে যে রং অনুপস্থিত অন্য ছায়াপথের ক্ষেত্রেও সেই সেই রং অনুপস্থিত। কিন্তু উপস্থিত রংগুলাের সব কয়টি বর্ণালীর লাল প্রান্তের দিকে একই পরিমাণে বিচ্যুত হচ্ছে। এই লাল বিচ্যুতির অর্থ ডপলার অভিক্রিয়া থেকে সহজেই বােঝা যায়। মনে করা যাক, কোন একটি স্থির নক্ষত্র থেকে একটি নির্দিষ্ট স্পন্দাংকের আলাে উৎসারিত হচ্ছে। তাহলে পৃথিবীতে আমরা ওই নক্ষত্রের যে আলাে পাব তার স্পন্দাংক এবং নক্ষত্র থেকে উৎসারিত আলাের স্পন্দাংক অভিন্ন হবে।

 কিন্তু নক্ষত্রটি যদি দ্রুতবেগে আমাদের দিকে এগিয়ে আসে তাহলে প্রথম তরঙ্গশীর্ষটি পাঠাবার পর নক্ষত্রটি যখন তার দ্বিতীয় তরঙ্গশীর্ষ পাঠাবে ততক্ষণে সে আমাদের অভিমুখে অনেকটা এগিয়ে আসবে। সেক্ষেত্রে দ্বিতীয় তরঙ্গটি পৃথিবীতে পৌছতে সময় নেবে কম। তার অর্থ হল কম সময়ের ব্যবধানে আমরা অধিক সংখ্যক তরঙ্গ শীর্ষ পাব। অর্থাৎ অগ্রসরমান নক্ষত্র থেকে যে আলাে আমরা পাব তার স্পন্দাংক নক্ষত্র থেকে উৎসারিত আলাের স্পন্দাংক থেকে বেশি হবে। ফলে তার তরঙ্গদৈর্ঘ্য কমে যাবে। অনুরূপভাবে অপসৃয়মান নক্ষত্র থেকে আগত আলােক তরঙ্গ পৃথিবীতে এসে দীর্ঘত হবে।

 কতটা দীর্ঘ হবে তা নির্ভর করে নক্ষত্রের অপসরণ বেগের উপর। তরঙ্গ দৈর্ঘ্য এবং গতিবেগের এই সম্পর্ককে বলা হয় উপলার অভিক্রিয়া (doppler effect)। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতায় আমরা কিন্তু অনেক সময়ই ডপলার ক্রিয়া প্রত্যক্ষ করে থাকি। যেমন রাস্তায় চলমান একটি গাড়ি যখন হর্ণ বাজাতে বাজাতে আমাদের অভিমুখে এগিয়ে আসে তখন দেখা যায় হর্ণের শব্দ ক্রমেই তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। আবার গাড়িটি যখন আমাদের কাছ থেকে দূরে অপসরণ করে তখন তার হর্ণের তীব্রতা নিম্নতর হতে থাকে। নক্ষত্রের আলাের ক্ষেত্রেও এই অভিক্রিয়াই পরিলক্ষিত হয়।

 আসলে শুধু নক্ষত্রলােক বা শব্দের ক্ষেত্রেই নয়, সব ধরনের তরঙ্গগতির জন্য এই অভিক্রিয়া সত্য। সুতরাং ডপলার অভিক্রিয়ার কারণে অগ্রসরমান নক্ষত্র থেকে আগত আলাে বর্ণালীর নীল প্রান্ত অভিমুখে (অর্থাৎ ছােট তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের দিকে) এবং অপসৃয়মান নক্ষত্র থেকে আগত আলাে বর্ণালীর লাল প্রান্তের দিকে (বৃহৎ তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের দিকে) বিচ্যুত হবে। বিচ্যুতি কতটা হবে তা নির্ভর করে নক্ষত্রের গতিবেগের উপর। অপসরণ গতিবেগ যত বেশি হবে লাল বিচ্যুতিও তত বেশি হবে। সুতরাং জ্যোতির্বিদরা পর্যবেক্ষণে নক্ষত্রদের যে লালসরণ দেখতে পেয়েছেন তার অর্থ হল এই সব নক্ষত্ররা আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়। যেহেতু এই নক্ষত্রদলের প্রত্যেকের লাল সরণ সমান এবং আমাদের ছায়াপথের অন্যান্য পরিচিত নক্ষত্রদের তুলনায় এদের লাল সরণ অনেক বেশি তাই অনুমিত হয় এই সব নক্ষত্ররা আমাদের ছায়াপথের অন্তর্ভুক্ত নয়।

 এরা অন্য ছায়াপথের বাসিন্দা। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এভাবে আমাদের ছায়াপথের বাইরে আরাে অনেক ছায়াপথ বা গ্যালাক্সির সন্ধান পেয়েছেন। এডুইন হাবুল বর্ণালী পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এই সব ছায়াপথের দূরত্বের তালিকা তৈরি করছিলেন। তখন ধারণা ছিল গ্যালাক্সিগুলাে আকাশে এলােমেলােভাবে চলমান। সুতরাং তাদের বর্ণালীর লালবিচ্যুতি এবং নীল বিচ্যুতি হবে সমান সমান। কিন্তু হাবল বিস্মিত হয়ে লক্ষ্য করলেন, প্রায় সব গ্যালাক্সিরই লালবিচ্যুতি রয়েছে এবং এই লালবিচ্যুতির পরিমাণও এলােমেলাে নয়। যে গ্যালাক্সি যত দূরে তার লালবিচ্যুতিও তত বেশি। এর থেকে তিনি দুটো সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন।

 এক, মহাবিশ্বের ছায়াপথগুলাে প্রত্যেকেই আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, এবং দুই, ছায়াপথের দূরত্ব এবং অপসরণ বেগ সমানুপাতিক। ১৯২৯ সালে তিনি এই আবিষ্কারের কথা ঘােষণা করেন। হালের আবিষ্কার থেকে মনে হতে পারে আমরা বােধ হয় মহাবিশ্বের এক সুবিধাজনক অবস্থানে আছি যেখান থেকে ছায়াপথগুলাে সব দূরে চলে যাচ্ছে। আসলে কিন্তু তা নয়। মহাবিশ্বের যে কোন অবস্থান থেকে দেখলে সব গ্যালাক্সিকেই দূরে সরে যেতে দেখা যাবে। ব্যাপারটা অনেকটা ফোলানাে বেলুনের মত। একটি বেলুনের গায়ে কয়েকটি কালির ফোটা দিয়ে যদি তাকে ফোলানাে হয় তাহলে দেখা যাবে যে বেলুনটা।

যত ফুলবে তার গায়ের ফোঁটাগুলাে ততই প্রত্যেকে প্রত্যেকের কাছ থেকে দূরে সরে যাবে। অথচ কেউ কারাের কাছে গিয়ে পড়বে না। বেলুনের স্ফীতির জন্যই এমন হয় । মহাবিশ্বের অবস্থাও অনুরূপ। আমাদের এই মহাবিশ্বের ছায়াপথগুলাে স্থানকালের বুকে এক একটা বেলুনের ফোটার মত। এদের মধ্যকার দূরত্ব যে বেড়ে চলছে তার কারণ এই নয় যে ছায়াপথরা নিজেরাই ছুটছে। আসলে মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে। বেলুনতলের মতই সে ক্রমাগত স্ফীত হচ্ছে। পার্থক্য এই যে বেলুন তল দ্বিমাত্রিক কিন্তু মহাবিশ্ব চারমাত্রিক।

 মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ সম্পর্কে ফ্রিডম্যানের ভবিষ্যদ্বাণী যে নির্ভুল ছিল হাল-এর পর্যবেক্ষণ থেকে তাই প্রমাণিত হল। মহাবিশ্বের সম্প্রসারণশীলতা আবিষ্কারের সংগে সংগে অলবার্সের সমস্যার সমাধানও সহজ হয়ে গেল। অলবার্স অত্যুজ্জ্বল রাতের আকাশ নির্মাণ করে যে সমস্যার সৃষ্টি করেছিলেন তার মূল কারণ ছিল স্থির বিশ্বের ধারণা। কিন্তু এখন আমরা জানি, মহাবিশ্ব সম্প্রসারণশীল। সেই জন্যই ছায়াপথগুলাে আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ফলে এই সব ছায়াপথ থেকে আগত আলাের লালবিচ্যুতি ঘটবে অর্থাৎ তাদের স্পন্দাংক কমে যাচ্ছে। স্পন্দাংক কম হওয়ার অর্থ শক্তি কমে যাওয়া। তাই অপসৃয়মান ছায়া পথসমূহ থেকে আমরা যে আলাে পাই তা অতি ক্ষীণ শক্তির।

তাছাড়া এসব ছায়াপথ থেকে আগত আলাে দূরত্বের ব্যস্ত বর্গের নিয়মে যখন পৃথিবীতে এসে পৌছে তখন তার তীব্রতা হ্রাস পায়। মূলত এই দুটি কারণেই দূরের ছায়াপথসমূহ থেকে পৃথিবীতে যে আলাে এসে পৌছায় রাতের অন্ধকারের উপরে তার খুব একটা প্রভাব পড়ে না। কাজেই রাতের আকাশ অন্ধকার কেন এই প্রশ্নের উত্তরে আমরা বলতে পারি, রাতের আকাশ অন্ধকার, কারণ রাতের আকাশে সূর্য থাকে না, এবং মহাবিশ্ব সম্প্রসারণশীল'। মহাবিশ্বের চিত্র সম্পর্কে আমরা এতক্ষণ যে আলােচনা করলাম তাতে এটা স্পষ্ট।
উত্তর প্রদান করেছেন (365 পয়েন্ট)

সম্পর্কিত প্রশ্নগুচ্ছ

1 উত্তর
22 মে 2021 "বিজ্ঞান" বিভাগে জিজ্ঞাসা করেছেন Arman (365 পয়েন্ট)
0 টি উত্তর
1 উত্তর
22 মে 2021 "বিজ্ঞান" বিভাগে জিজ্ঞাসা করেছেন Arman (365 পয়েন্ট)
1 উত্তর
24 সেপ্টেম্বর 2021 "বাংলা ব্যাকরণ" বিভাগে জিজ্ঞাসা করেছেন AbirN (6,516 পয়েন্ট)

17,573 টি প্রশ্ন

17,275 টি উত্তর

24 টি মন্তব্য

54,717 জন সদস্য

15 Online Users
0 Member 15 Guest
Today Visits : 12810
Yesterday Visits : 32054
Total Visits : 16048593
...